Biobd Logo

Biography Bangladesh

একজন আলোকিত সাদা মনের মানুষ -মি. ডেভিড এ, হালদার

বর্তমান যুগটা বড়ই যান্ত্রিক। এ যুগে মানুষ বড়ো আত্মকেন্দ্রিক। নিজের জগত নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় অন্যকিছু নিয়ে ভাবার সময় কারোর নেই। মানুষ যেন ভুলে গেছে গীতার সেই অমৃত বানী “যত্র জীব তত্র শিব” অর্থাৎ স্রষ্টার সৃষ্টির মধ্যেই শিব বা সৃষ্টিকর্তা বিরাজমান । আর সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে ভালবাসলেই স্রষ্টার নৈকট্য লাভ সম্ভব। স্বার্থপর পৃথিবীতে নিজস্বার্থ ছেড়ে নিস্বার্থ হওয়া সাদা মনের মানুষ পাওয়া ভার। কিন্ত এই কঠিন ব্যস্তবতায়ও কিছু মানুষ থাকে যাঁদের জন্যই বোধকরি আমরা এগিয়ে যাবার আলো দেখতে পাই। তেমনি একজন আলোকিত মি ডেভিড এ, হালদার ।
কিছু না লিখলে বা না দাগ দিলে যেমন সাদা কাগজের মূল্য থাকে না, ঠিক তেমনি ব্যক্তির জীবনে মনুষ্যত্ব কাজ বা গুন প্রকাশ না হলে প্রকৃত মানুষ তাকে বলে কি? আমরা এই কলমে এমন এক মানুষকে তুলে  ধরতে চাই যার হৃদয, কাজ, চেহারা, ব্যক্তিত্ব অতুলনীয়। হৃদয়টা হচ্ছে শিশুতুল্য সহজসরল, স্নেহ-ভালোববাসায় পূর্ণ। স্বার্থ ছাড়া অতি পরিশ্রমী, অসহায়কে সাহায্য দানই হচ্ছে তাঁর কাজ । আর যদি চেহারার কথা বলি, তাহলে বলবো হাজারো লোকের মাঝেও আমি তাঁর মিল পাইনি । সাধারন পোশাক-আশাক পড়েই তিনি একজন সুন্দর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আমি তাঁকে খুজে পেয়েছি ঢাকার অদূরে সাভার কমলাপুরে। বিভিন্ন জাগায় ছড়িয়ে আছেন বলেই হয়তো বা আপনারা জানেন না কমলাপুরে একটি স্বর্গ সুখের রাজ্য আছে । সবাই এখানে সুখী । আর কেনই বা সুখী তা জানানোর জন্যই এই লেখা । মি ডেভিড এ, হালদার শুধূ আমার চোখেই নয়, আরো অনেকের চোখেই তিনি এক সাদা মনের মানুষ।
 
১৯৯০ সাল থেকে শিশু সন্তান বাড়তে থাকায় নিজ গৃহে জায়গা হচ্ছিল না । পরে ১৯৯৩ সালে তিনি সাভার গেন্ডায় বাড়ী ভাড়া করে সেই ২০০ অসহায় শিশুদের থাকতে দিলেন । নিজের পকেটের টাকা শেষ করেও বসে থাকেননি, এ সমস্ত বাচ্চাদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্যই তিনি অফিসে কাজ করেছেন। আর দিনের কর্মকান্ডের শেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন চোখের জল দিয়ে । এরপর কিভাবে চলবেন? তাঁর একটাই বিশ্বাস ছিল যে সৃৃষ্টিকর্তা সব জানেন, তিনি কাউকে নিরাশ করেন না । আর হ্যাঁ তাই হলো । দেশ-বিদেশী লোকের সাহায্য সহযোগীতার ফলে বেশ উপকৃত হয়েছিলেন, বিশেষ করে উল্লেখ্য যে মি: ও মিসেস: শ্যামসন এইচ চৌধুরী  ২ একর জমি কিনে দেন সমরিতান শিশু পল্লীকে । বর্তমানে এখানে ৭ একর জমির উপর স্কুল, ছেলে ও মেয়েদের আলাদা বাসস্থান রয়েছে, খেলার মাঠসহ। পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তা তাঁকে এত ভালোবাসেন বলেই তিনি তাঁর ভালবাসার দর্শনে ৪৫০ জন ছেলেমেয়ের জীবন গঠন করতে পারছেন, কষ্ট হলেও এখানো সুশৃংখল ও নৈতিকতা শেখানোর জন্য ছেলেমেয়েদের দায়িত্বে রেখেছেন তিনি ৭৮ জন লোক । স্কুল রয়েছে এখানে। 

একজন আলোকিত সাদা মনের মানুষ মি ডেভিড এ, হালদারের গল্প

ভিতরের ছেলেমেয়েই শুধু এখানে পড়ে না, আশ-পাশ গ্রাম থেকেও এখানে ছেলেমেয়ে পড়তে আসে । ক্লিনিক রয়েছে, অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্স, প্যাথলজিস্ট রয়েছে যাতে ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি বাইরের লোক সাহায্য পায় । ভকেশন্যাল ট্রেনিং ব্যবস্থা, সেলাই প্রকল্প ও কম্পিউটার ট্রেনিং ব্যবস্থা থাকার কারণে যে সমস্ত ছেলেমেয়ে দুর্বল তাদেরকে তিনি সুন্দরভাবে বেচেঁ থাকার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন । গ্রামের মহিলাদের আর একটু সাহায্য বাড়িয়ে দেবার জন্য মাইক্রো-ক্রেডিটের ব্যবস্থাও করেছেন। অফিস স্টাফদের থাকার জন্য ও অসুস্থ্য ব্যক্তিদের সেবা ও বিশ্রামের জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। এখানের ছেলেমেয়েরা বলতে গেলে খুবই ভালো আছে। এতসব সুযোগ, আরাম-আয়েশ, জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরন করে মি: হালদার এখানের সবাইকে সুখের রাজ্যে বসবাস করাচ্ছেন। এত কিছু করার পরও তিনি বসে থাকেননি। সাভার রাজাশনে জয় হোষ্টেল নামে একটি হোষ্টেল তৈরী করেছেন,  এস. এস. সি পাস করা ছেলে-মেয়েরা যেখানে নিরাপদে থেকে কলেজে  যেতে পারে। বুদ্ধি জ্ঞান সকলের মাঝে আছে তবে তার সব রকমের ব্যবস্থা থাকা দরকার। আর এই ব্যবস্থা মি: ডেভিড এ, হালদার করেছেন বলেই, এ সমস্ত ছেলেমেয়েদের মাঝ থেকে বের হয়েছে ইন্টার, ডিগ্রি, অনার্স এমন কি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় পড়া ছ্ত্রা-ছাত্রী। অবাক হচ্ছেন কি? মি: হালদারের মতো এমন মনের মানুষ যদি আরো কেউ বেরিয়ে আসতো, তাহলে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতো কিছু অসহায় শিশু। আপনার সমাজ, আপনার দেশ এমন কি আপনার ভিতরের মনটাকে আনন্দিত করাতে পারতেন একদিন। যেমন আজ সবকিছুর জন্য একটু হলেও গর্ববোধ করছেন মি: ডেভিড এ, হালদার। 

একজন আলোকিত সাদা মনের মানুষ মি ডেভিড এ, হালদারের গল্প

২৬ বছর যাবত মি: হালদার নিজ পরিশ্রম, দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে গঠন বা নির্মান করেছেন এতসব কার্য প্রতিষ্ঠান। সমস্ত কর্মকান্ডকে আসলে এককথায়- H.E.L.P- Bangladesh  নামে পরিচয় করানো হয়। HELP নামের অর্থ চার অক্ষরে ভাগ করা হয়েছে।  যেমন- Health Education Leadership Program প্রতিষ্ঠাতা মি: ডেভিড এ, হালদারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- ম্বাস্থ্য, শিক্ষা, দায়িত্ব, সমস্ত কার্যক্রম নিয়ে সমাজের অবহেলিত অসহায় বাচ্চাদের মুখে হাসি ফুটানো। তিনি পরিবার,  আত্মীয়-স্বজন সবার কাছ থেকে দূরে সরে এই সমস্ত শিশুদেরকে ভালবেসে কাছে থেকে তাদেরকে শিক্ষা দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করছেন। কোন স্বার্থ আছে কি? না নেই। কারন আমি তার প্রতিষ্ঠানের একজন অসহায় ছেলে, যে কিনা আপনাদের এই সমস্ত কথা আপন মনে আপনাদেরকে লিখে জানালাম। নিজ চোখে দেখে সমস্ত কিছু পেয়ে আমি আজ আনন্দের সাথে লিখছি- আমাদের অবস্থার কত পরিবর্তন। আজ আমাদের সব আছে। অভাবের দ্বার খোলার আগেই কাটিয়ে উঠতে পারি সৃষ্টিকর্তার সাহায্যে। পরিশ্রম করে হাসি মুখে যে কষ্ট সহ্য করতে পারে, সে প্রকৃত সুখ পায়। আমরাও সুখী। তাঁর এই জীবনে আমাদের কাছ থেকে  কিছু চান না তিনি । এত সব কাজ করেও তিনি ভুলে যাননি পিতা হিসাবে বড়  ৯ জন মেয়ে এবং ৫ জন ছেলেকে সু-যোগ্য ছেলে/মেয়ের  হাতে তুলে দিতে । আসলে তিনি কি সহজ সরল, দায়িত্ববানও পরিশ্রমী মানুষ তাই না? জীবনটাকে কাটিয়ে দিয়েছেন অন্যের সাহায্যে, উপকারের জন্য। কোন লোক তার স্ত্রীকে বলতে পারে যে,  আমার দুই সন্তানের জন্য তুমি (মা) আছ । কিন্তু এ সমস্ত বাচ্চাদের তো কেউ নেই । কতটুকু ভালবাসা , মায়ামমতা, উপকার, সেবাদান করার ইচ্ছা থাকলে এই সমস্ত কার্য ও স্ত্রীকে এই বাণী বলতে পারে। তাঁকে কি নামে জানব আমরা এই সমাজে? সাদা মনের মানুষ নয় কি ? মি: হালদারের প্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়েদের প্রাণের ইচ্ছা তাঁর জীবন অনুসরণ করা । 

….জুয়েল হালদার…
সংবাদকর্মী